ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রতারণার ফাঁদে পড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশের নাগরিকরা, খোঁজ নেই অনেকের

লক্ষ্মীপুরের মাকসুদুর রহমান উন্নত জীবনের আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণার শিকার হয়ে তাকে যেতে হয় রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে।
  • নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
প্রতারণার ফাঁদে পড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশের নাগরিকরা, খোঁজ নেই অনেকের ফাইল ছবি

নিজের ইচ্ছায় নয়, প্রতারণার শিকার হয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন অনেক বাংলাদেশি। যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ওপর চালানো হয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ঠিক কতজন বাংলাদেশি বর্তমানে রুশ সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করছেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব কারও কাছে নেই। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এরইমধ্যে মারা গেছেন, আবার অনেকের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।


লক্ষ্মীপুরের মাকসুদুর রহমান উন্নত জীবনের আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণার শিকার হয়ে তাকে যেতে হয় রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে। সেখানে গিয়ে তিনি সৈন্যদের কাছ থেকে জানতে পারেন, রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিনামায় তাকে ‘বিক্রি’ করে দেয়া হয়েছে।


প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতা মুন্সীগঞ্জের মোহন মিয়াজিরও; তিনি পরে রাশিয়া থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। প্রেস অ্যাসোসিয়েটসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারা এসব কথা বলেন। এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার মোহাম্মদ আকরাম হোসেন রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হন।

 

লক্ষ্মীপুরের সালমা আক্তার জানান, গত বছরের মার্চে তার স্বামী আজগর হোসেনের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, তাকে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

 

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভালো বেতন ও নিরাপদ চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। তারা মনে করেন বৈধভাবে কাজ করতে যাচ্ছেন, কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে।

 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরীফুল হাসান বলেন, একই গ্রামের একাধিক বাংলাদেশি রাশিয়ায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়েছেন। বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে কাজের কথা বলে তাদের নেয়া হলেও সেখানে গিয়ে তারা প্রতিশ্রুত কাজ পাননি।

 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা ফেলো জাহান শোয়েব বলেন, যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পাঠানোর পর তাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া চুক্তিপত্রগুলো সম্পূর্ণ রুশ ভাষায় থাকায় অনেকেই বুঝতে পারেন না, আসলে সেখানে কী লেখা আছে।

 

তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যারা ফিরেছেন তাদের বাইরে আরও কত বাংলাদেশি রুশ ফ্রন্টলাইনে আছেন, তার সঠিক হিসাব নেই। গত ডিসেম্বরে সময় টেলিভিশনের হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজে একটি কক্ষে অন্তত ২৮ জনকে দেখা যায়, যারা এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মরিয়া ছিলেন।

 

বিআইআইএসএসের রিসার্চ ফেলো জাহান শোয়েব বলেন, বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই তৎপরতা বন্ধ না হলে এটি ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরীফুল হাসান বলেন, রাশিয়ান দূতাবাস বা বাংলাদেশে রাশিয়ার মিশনের সহযোগিতা ছাড়া ঠিক কতজন যুদ্ধে আছে, তারা কোথায় আছে-এসব শনাক্ত করা খুব কঠিন।

 

শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়া ও আফ্রিকার আরও অনেক দেশ থেকেই প্রতারক চক্র এভাবে সহজ-সরল মানুষকে ফাঁদে ফেলে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


thebgbd.com/NIT