ট্রাম্পের শুল্ক নীতির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্ট মন্দা পরিস্থিতিতে সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। জুলাই এবং আগস্ট মাসে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও গত দুই মাস ধরে বাংলাদেশের সার্বিক রপ্তানি আয় কমেছে। এমনকি তুলনামূলক কমমূল্যে পণ্যের অর্ডার নিতে বিদেশি ক্রেতারা চাপ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ৯ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এরমধ্যে জুলাই মাসে ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হিসাবে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হলেও তার পরের দুই মাসে কমেছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্প্রিং মৌসুমের ঠিক আগেই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন শুল্কহার আরোপ করায় এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ বিজিএমইএর। বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ডিসেম্বরে ক্রিসমাস ডে, ব্ল্যাক ফ্রাইডে এবং নিউ ইয়ার-এই সময়গুলোতে বিপুল পরিমাণ পোশাক রফতানির অর্ডার আসে। কিন্তু ট্যারিফের কারণে অনেক সময় আমরা সেই অর্ডারগুলো ধরতে পারি না, এতে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়।
বড়দিন-ব্ল্যাক ফ্রাইডে এবং নিই ইয়ারের অর্ডার তুলনামূলক কম পেলেও জুলাই-আগস্ট মাসে ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। কিন্তু শুল্ক জটিলতায় বিদেশি বায়ার প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের বাড়তি দামতো দিচ্ছেই না, বরং আরও কম মূল্যে পণ্যের অর্ডার নিতে চাপ প্রয়োগ করায় এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
বিজিএমইএর পরিচালক সাইফুল্লাহ মনসুর বলেন, ক্রেতারা এবার গত বছরের তুলনায় অন্তত ১০ শতাংশ কম দামে পণ্য কিনতে চাইছে। কিন্তু আমাদের ওপর যে ২০ শতাংশ ট্যারিফ আছে, তাতে আমরা ১০ শতাংশ ছাড় দিলেও বাকিটা মেলানো সম্ভব হচ্ছে না। যদি শেষ পর্যায়ের রিটেইলাররা; যারা দোকানে ট্যাগ লাগায় তারা মূল্য না কমায় তাহলে আমাদের পক্ষে দাম কমিয়ে অর্ডার নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক নানা জটিলতার পাশাপাশি ট্রাম্পের নেয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্তের কারণে এমনিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চলছে অর্থনৈতিক স্থবিরতা। এর ফলে সেখানে তৈরি পোশাক বিক্রির হার কমে যাওয়ায় সংকটে পড়ছে বাংলাদেশ। বিজিএমইএর পরিচালক এ. এম. মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ট্রাম্পের কিছু নীতির কারণে যেমন ভিজিটর রেস্ট্রিকশন, জব মার্কেটে অনিশ্চয়তা-এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এক ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলেই এখন রফতানির পরিমাণে কিছুটা কমের ধারা চলছে।’
তবে সংকট উত্তরণে দেশের বন্দর-অফডক ট্যারিফ যেমন কমাতে হবে, তেমনি প্রণোদনা এবং নীতি সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। কারণ অভ্যন্তরীণ খাতের ট্যারিফ বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি বায়ার প্রতিষ্ঠানে বেঁধে দেয়া দর ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস. এম. আবু তৈয়ব বলেন, ‘প্রণোদনা বা নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে যদি ব্যাংক থেকে স্বল্পসুদের ঋণের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অন্তত এই সংকটকালীন সময়টা পার হওয়া সম্ভব। এরপর যখন বাজারের সমন্বয় হবে, তখন আমরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারব।’
গত চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে টিকে থাকতে হলে শুধু ইউরোপ-আমেরিকার মতো প্রচলিত বাজারেই নয়, অপ্রচলিত দেশগুলোতেও নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে-এমনটাই মনে করছেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা।
thebgbd.com/NIT