নেপালে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভে নিহতদের শোকাহত পরিবারগুলো বলেছেন, তারা আশা করেছেন, বিক্ষোভের মৃত্যু কখনো বৃথা যাবে না। কারণ, বিক্ষোভকারীদের পছন্দের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী শনিবার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এরআগে গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় প্রসিডেন্টের কার্যালয় শীতল নিবাসে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ বাক্য পাঠ করান প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউদেল। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় শুক্রবার রাতে একথা জানিয়েছে জানিয়েছে। কাঠমান্ডু থেকে এএফপি এই খবর জানিয়েছে।
চলতি সপ্তাহে দুই দিনের প্রতিবাদ-বিক্ষোভে নিহত ৫১ জনের মধ্যে ৩০ বছর বয়সী সন্তোষ বিশ্বকর্মাও ছিলেন। এক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের অবসান এবং ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তির পর এটিই ছিল তার জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ সরকার বিরোধী প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। তার বিধবা স্ত্রী আমিকার (৩০) শোকে চোখ ফুলে উঠেছে। তিনি তার স্বামী ‘জাতির জন্য অবদান রেখে মৃত্যুবরণ’ করার ‘চূড়ান্ত স্বপ্ন’ স্মরণ করেন। সোমবার ছাত্র-জনতার ‘জেনারেশন জেড’ আন্দোলনের নেতৃত্বে বিক্ষোভের প্রথম দিনই সন্তোষকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ফলে বিক্ষোভ শুরু হয়। যা দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত হতাশাকে ব্যাপক ক্ষোভে পরিণত করে।
কাঠমান্ডুতে তার সাদাসিধে বাড়িতে আমিকা তার প্রয়াত স্বামীর ফ্রেমে বাধা একটি ছবি ধরে এএফপি’কে বলেন, ‘সন্তোষ বলতেন, তিনি কুকুরের মতো মরবেন না। তার স্বপ্ন ছিল নেপালকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করা এবং সে তা করে দেখিয়েছে।’
আমিকা এখন তার ১০ বছরের ছেলে উজ্জ্বল এবং সাত বছরের মেয়ে সোনিয়াকে একাই বড় করবেন। তিনি এখন সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী তাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য সবকিছুই করতেন। এমনকি তার জীবনের বিনিময়েও। কিন্তু এখন কীভাবে একা সবকিছু সামলাবো? তিনি দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমি আশা করছি নতুন সরকার আমাকে সাহায্য করবে।
সন্তোষের পারিবারিক বন্ধু ৪২ বছর বয়সী সোলান রাই বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, বিক্ষোভগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আশা করি এবার আমরা অবশেষে প্রকৃত পরিবর্তন দেখতে পাব। এবারের ক্ষোভ ‘আমরা আগে যা দেখেছি তার চেয়েও তীব্র’ ছিল।
এদিকে বিশ্বব্যাংক বলেছে, নেপালের ৮২ শতাংশ কর্মজীবী অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। তাদের মাথাপিছু জিডিপি মাত্র ১,৪৪৭ ডলার। যা বিশ্বের সর্বোচ্চ হারের মধ্যে একটি।
শুক্রবার কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরে শত শত মানুষ গণ-শবদাহের জন্য জড়ো হয়। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ যুবকদেরসহ প্রিয়জনদের মৃতদেহের জন্য পরিবারগুলো কাঁদছিল।
সন্তান হারা আরেক মা রত্না মহারজন তার ছেলের জন্য শোক প্রকাশ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আশা করি কিছু ন্যায়বিচার হবে এবং আমাদের জনগণ অবশেষে সেই পরিবর্তন পাবে যা তারা এত মরিয়া হয়ে চেয়েছে’।
একজন মা তার ছেলের দেহটি ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাকে কাফনে মোড়ানো অবস্থায় মন্দিরের সিঁড়িতে জড়িয়ে ধরেন। কাছাকাছি, পুলিশ অফিসাররা তাদের নিহত সহকর্মীর মাথায় গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন, যখন ধোঁয়ায় ভরা নদীর তীরে একটি বিউলার বেজে ওঠে।
আমিকার যুক্তি ছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা যা চাই তা খুব বেশি কিছু চাওয়ার মতো নয়, শুধু সমতা। তাই যখন দরিদ্ররা নিঃস্ব থাকে, তখন আর ধনীরা উন্নতি করতে পারে না।’
সূত্র: এএফপি
এসজেড